শনিবার, ৮ অক্টোবর, ২০১১

'টকটাইম' ছোটগল্প


টক টাইম

হিমাদ্রি বন্দ্যোপাধ্যায়


--- সন্দীপ বাবু !  
পেছন থেকে মাধব বাবু ডাকতেই ফিরে দাঁড়ালাম । দোকানদার মাধবদা ডাকছে । মনে মনে ভাবলাম, কীরে বাবা ! সেই টাকা-টা লোকটা গুনলোই গুনলো ! আর যদি বা গুনলোই, তবে ডাকছে কেন? আবার ভাবি, ডেকেছে তো ? ঠিক শুনেছি তো ? বেশি দিতে গিয়ে কম দিলাম না তো ? চোরের মন নানা কথা বলে ।
মাধব বাবু-র দোকান থেকে একটা নতুন মোবাইল কিনলাম । আমার মাল্টিমিডিয়া- ফিডিয়া দরকার নেই । যে কোনো একটা হলেই হোল । কিন্তু সেই মাল্টিমিডিয়া-ই কিনলাম । বস্তুটা ভালো দামী হতে হবে । মাধব বাবু-র যেন পরতা থাকে । তাই দাম বেশি দিয়ে কিনেছি । দরদাম করে রফা করে তো টাকা গুণেই দিলাম । তাহলে ডাকছে কেন ?
মাধব দা । তাকে পাড়ার সকলে ডাকে ঐ এক নামে । এটাই তার ডাক নাম হয়ে উঠেছে আজ । বাবা-ও মোবাইল রিচার্‌জ করাতে এলে ডাকে মাধব দা বলে, ছেলেও টাকা ভরতে  গিয়ে সেই মাধব দা । আমাদের বাজার থেকে বেরিয়ে যদি ডানদিকে টার্ন নেওয়া যায়, তবে একটা দশকর্মা র দোকানের পরেই মাধব বাবুর দোকান । দোকানে হরেক রকম জিনিস পাওয়া যায় । বাচ্চাদের স্কুলে যাবার পথে টিফিনের কেক, মিনারেল ওয়াটার, লেইজ, কুরকুরে ভাজা, ডট পেনের রিফিল, পেন্সিল, বেশ কিছু মাপের খাতা, চানাচুর, বাদাম নানা আকৃতির বয়ামে হরেকরকম্বা………। তার মধ্যে বহুদিন থেকে মোবাইল রিচার্‌জের একটা ছোট মতো ব্যবসা শুরু করেছে সকলের মাধব দা । আর সত্যি সত্যি সকলেই আসে তার দোকানে রিচার্‌জ করতে । ইজি-ও হয়, কার্ড-ও হয় । আমি জানি না, এতে কত পরতা থাকে রিটেলারের। আবার গত বছর খানেক ধরে দোকানে কয়েকটা মোবাইলও রাখছে সে । এই গুটিকয় । কমদামী । আজকাল যে চোদ্দ-পনেরো হাজার টাকা-র মোবাইল সেট দেখা যায় ছেলে-ছোকরাদের হাতে, তা নয় । ঊর্‌দ্ধে হাজার তিনেক দাম । আফটার অল, সকলের মাধব দা বেশ ব্যস্ত থাকে তার দোকান নিয়ে । আমার অফিসের পাশেই সাধারণত রিচার্‌জ করি আমি । কিন্তু আমি ক্কচিত-কদাচিৎ এই দোকানটাতে যাই রিচার্‌জ করাতে । তবে হয়তো কখনও কখনও চানাচুর বা বাদাম কিনতেও যাই । তাও সে ন-মাসে ছ-মাসে ।
সম্প্রতি আগের মোবাইলটা চুরি গেছে । চুরি না বলে ডাকাতি বলা ভালো । ট্রেনে । মোবাইলটা ট্রেনে কে যেন ব্যাগের চেন কেটে নিয়ে মেরে দিয়েছে । তাই ভাবলাম, নতুন একটা কিনতে হবে । কিনতেই হবে । না কিনলে তো সংসার টেঁকে না । যখন তখন ডিভোর্স হয়ে যেতে পারে । আমার মোবাইল তো জরুরী ফোন করা, আর ফোন এলে ধরার জন্যে । কিন্তু তার তো কোনো উপায় নেই । আগেরটা কেনার সময় ছেলে বলেছিলো,
--- বাবা, একটাই তো সেট কিনবে । বারবার তো নয় ।
এমন করে বলল যেন আমি বাড়ি করছি । একটাই তো বাড়ি করবো । বারবার তো নয়। এরা নতুন নতুন শব্দ আবিষ্কার করছে । আজকাল এটাই চলছে । মোবাইল-কে সেট, সিনেমা-কে বই, আরো কত কি ! আবার সভ্যতায় মোবাইল যুক্ত হওয়ায় তো আরও শর্ট হচ্ছে শব্দভাণ্ডার । এস.এম.এস. মানে শর্ট মেসেজ । তাতে যা লেখে আজকাল, সব শর্ট-কাট । ইংরাজির ইউ মানে তুমি লিখতে গেলে সোজা এ্যালফ্যাবেটের ইউ- টা বসিয়ে দিচ্ছে । অথবা ইংরাজি হরফে বাংলায় তুমি আর আমি লিখতে গেলে লিখে দিচ্ছে ‘U r me’
যাইহোক, আমার ছেলে পড়ে ক্লাশ সেভেনে । ছেলের কথার মানে না বুঝে বললাম---তা তোর মত-টা কী ? তুই চাইছিসটা কী ?
--- একটা মাল্টি মিডিয়া কেনো অন্তত । যাতে আমি নেট-টা করতে পারি । মোবাইল-এ তো একটু সস্তা পাই ।
--- ক্লাশ সেভেনে নেট ! নেটে তুই করিসটা কী ?
--- ও কত রেফারেন্স থাকে । তা নয়তো মার্ক্স দেবে না ।
ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হতেও পারে । তাই একটা দ্ব্যর্থবোধক শব্দ বের হলো আমার মুখ দিয়ে--- অ !
ছেলে বলল--- তাছাড়া ধরো, তুমি অফিস যাচ্ছ । জ্যামে আটকে আছো । চুপচাপ বসা । কিচ্ছু করার নেই । তখন যদি মোবাইলে গান লোড করা থাকে, তবে ঐ সময় মনটা অস্থির হয় না। কানে ইয়ারফোন গুঁজে দাও । চোখের সামনে অসহ্য জগৎ থেকে মুক্তি । বসে বসে বা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গান শোনো । তুমি যে গান পছন্দ করো । পুরনো দিনের বাংলা আধুনিকই সই ।
আমি কী করে ওকে বোঝাবো, ওরে, বাস জ্যামে পড়লে কানে গান ঢোকে না । চোখের সামনে বসের আক্রোশ ভরা চোখদুটো ভেসে ওঠে । চাকরী কর্‌ । বুঝবি । আবার আমার মতো প্রাইভেটে । কিন্তু কিছু বলতে পারলাম না । আমার চোখমুখ-এর ভাব দেখে ছেলের মা লাফিয়ে পড়লো,
--- আহা ! ও তো ওর জন্যে কিনে দিতে বলেনি । তোমার জিনিস, তোমাকেই একটা পরামর্শ দিয়েছে । তোমারই স্বার্থে । সন্তান বড়ো হলে তাদের কথা একটু-আধটু শুনতে হয় । তবে তো ওরা বোঝে যে বাবা-মা ওদেরকে মূল্য দ্যায় ।
বেবি-র কথাটা মিথ্যে নয় । হয়তো এতদিনে ছেলের মা একটা মূল্যবান কথা বলে  ফেলেছে । তাকে মূল্য দিতে হবে । শুনতে হবে ছেলের কথা । কিনলাম সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে একটা ঝাঁ চক্‌চকে মোবাইল সেট । ব্যস, সন্তানের মাতা অচিরেই বুঝে গেলেন, কেন সন্তান তার বাবা-কে সেটি কেনাবার জন্যে চেপে ধরেছিলো । বাড়িতে ঢোকা মাত্রই সেটা চলে যেতো ছেলের হাতে । সে তখন এটা টিপছে, সেটা দেখছে, আর কানে আছে সেই ইয়ারফোন । আমার মোবাইলে একটিও বাংলা আধুনিক গান লোড করার কোন জায়গা সে রাখেনি । তার পরিবর্তে গাদা গাদা মুম্বাই মার্কা গানে ভরে দিয়েছে । আমি বাড়ি এলে সেলফোনটি সে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যায় । বলে যায়,
--- বাবা, তোমার ফোন এলে ঠিক তোমার ঘরে পৌঁছে দেবো ।
প্রথম দিন কিছু না বললেও পরে বুঝলাম, এবং দেখলাম, সে কানে ছিপি গুঁজে শুনছে তো শুনছেই । মাথা নাড়ছে তো নাড়ছেই । কোথায় নেট, কোথায় কী ! ভাবলাম, মাধব বাবু বোধহয় এতে গান-টান লোড করে দিয়েছেন । ছেলেকে জিজ্ঞেস করতে শুনলাম, এতে নাকি পড়াশুনোয় ওর কনসেন্ট্রেশন বাড়ে । কে জানে, এটা কোন শ্রেণীয় কনসেন্ট্রেশন । আমরা তো আর কনসেন্ট্রেশন দিয়ে পরাশুনো করিনি । রাস্তাঘাটেও সেই একই দৃশ্য । ছেলেমেয়ে--- সব চলেছে কানে ছিপি গুঁজে । হয় গান শুনছে, নয় কথা বলছে । কী যে বলছে, কাকে বলছে, কে জানে । এ্যাতো টকটাইম পাচ্ছে কোথা থেকে? তাই বা জানে কে ? টেলিভিশনে যে এ্যাতো বিজ্ঞাপন, কানে মোবাইল নিয়ে গাড়ি চালাবেন না, মোটর সাইকেল চালাবেন না, রাস্তা পার হবেন না, রেল লাইনে হাঁটবেন না--- তা কে শোনে কার কথা ! আজকাল তো বিজ্ঞাপনে লিখছে এ কথাই শেষ কথা নয়তো ? তবুও কে শোনে ! মানুষকে নাকি এ্যাওয়ার করতে হবে । একটা বাচ্চাও তার জানের মায়া করে । কোনো উঁচু জায়গা থেকে সে লাফিয়ে নামে না । জানে, পড়ে যাবে । আর এই দামরাগুলোকে নাকি এ্যাওয়ার করতে হবে । হেসে বাঁচি নে ।
পরদিন যখন অফিস যাবার সময়, তখন মোবাইল সেট-টা আমার হাতে আসে । দেখি, তিন-চারটে মিস্‌ড কল । হয় অফিসের হেড ক্লার্ক, নয় স্বয়ং বসের কল, অথবা আমার পাশের টেবিলের দাস-দা, নতুবা ট্রেন পথের একটা সহযাত্রীর ।
এতো গেলো ছেলের নাটক । এবার তার মাতৃ দেবী । রবিবার তো বটেই, অন্য অন্য দিন তার ছেলের থেকে তার দয়াময়ী মা মোবাইল-টা কেড়ে নিয়ে যায় । এরপর চলে গপ্পো । এর সাথে বা তার সাথে । অকারণ । এই কী রাঁধলি ? শাশুড়ি কী বলল ? কোন সিরিয়াল দেখলি ? কোন কোন দৃশ্যে কাঁদলি ? অমুক ক্যারাকটার-টা বেজায় পাজি, তমুক ক্যারাকটার-টা ভীষণ ভালো, এরপর কী হবে, হয়তো তমুকের বিয়েই হবে না…. ইত্যাদি। তারপর ফোনের অপর প্রান্তে যে আছে, তার ছেলের বৌ-এর আদ্যশ্রাদ্ধ করা, আর একজনের বিবাহিতা মেয়ের শাশুড়ির সপিণ্ডকরন করা তো আছেই । আমার টকটাইম যায় । কাজের কথা বলতে গিয়ে দেখি, টাকা নেই । যাকে আজকের ভাষায় বলে--- ব্যাল্যান্স নেই । তাই আমি ডিস-ব্যাল্যান্সড হই ।
সেদিন রবিবার । একটা জরুরী ফোন করবো । ছেলের ঘরে গিয়ে দেখি, মোবাইলটা তার কাছে নেই । তার মার কাছে । শুনলাম, তিনি কাকে যেন ফোনে আগের দিন দেখা একটা মেগা সিরিয়ালে কী কী ঘটেছে, তার ফিরিস্তি দিচ্ছেন । ফোনের অপর প্রান্তে যে আছে, সে নাকি আগের দিন কোথায় গিয়েছিলো । সে দেখতে পায়নি সেই জ্বালাতনি সিরিয়ালের খলচরিত্রের জনৈকা প্রতিবেশিনীর শয়তানি-বজ্জাতি কাণ্ড । মাথাটা গরম হয়ে গেলো । অগ্র-পশ্চাৎ না ভেবে মোবাইলটা হাত থেকে কেড়ে নিলাম । ধমকে উঠলাম,
--- এটা কী হচ্ছে ? এটা কি সমাজসেবার বিনি পয়সার সেলফোন নাকি ? তোমাদের কি একটু কাণ্ডজ্ঞান থাকবে না ! পয়সা আয় করেছো জীবনে ? জানো, তার কী মূল্য ? জানলে এভাবে নষ্ট করতে না ।
ব্যস, ফুটন্ত তেলে যেন বেগুন পড়লো । কেঁদে-কেটে আমার সিরিয়ালপ্রেমী সমাজসেবিকা স্ত্রী একটা ভয়ানক কাণ্ড করলেন । এ্যাতোটাই করলেন যে, আমি ভয় পেয়ে গেলাম । দেখলাম, আমার ব্যাল্যান্সে আছে মাত্র পনেরো পয়সা । কার মাথা ঠাণ্ডা থাকে ! তখন বৃষ্টি পড়ছে । ছুটে গেলাম মাধব বাবুর দোকানে । এখনই টাকা ভরতে হবে। একটা ফোন করতে হবে দাস দা-কে। জরুরী । তবে এই ফোন কেলেঙ্কারির বিরাট খেসারতই শুধু দিতে হলো না আমাকে, আমার গায়ে এক বালতি কালো রং ছুঁড়ে দিলো সেই দিনটা ।
সেদিন তো রান্না-বান্না কিছুই হোল না । কোনোরকমে আলুভাতে, কুমড়ো ভাতে--- এইসব ভাতে ভাত করে খেলাম বাপ-বেটায়। কিন্তু বেবি, মানে আমার স্ত্রী সেদিনকার মতো অনশন করলেন । কাকুতি-মিনতি করে কোনো লাভ হোল না। উপোষ করা তার একটা বাতিক আছে । ফলে সেটা বিরাট কিছু নয় । কিন্তু পরেরদিন সেই উপোষ থাকতে একটু অসুবিধায় পড়লাম । অবশেষে তার হাতে তুলে দিলাম আমার মোবাইল । তার সাথে পাঁচশো টাকার টকটাইম । মাসের শেষ । এ্যাতো টাকা ভরার কোনো মানে হয় না । দাস দা-কে ফোন করে ব্যাল্যান্স চেক করতে গিয়ে দেখি, ভরেছি, তেত্রিশ টাকা আর ব্যাল্যান্স দেখাচ্ছে পাঁচশো বারো টাকা । চেপে গেলাম । এখন তো ঘর সামলাই । তখন বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি আর ঘরেও অঝোরে ঝরছে । ছেলে পর্যন্ত আমাকে দোষ দিয়ে বলল,
--- হাতি ঘোড়া তো নয়, বাবা । তোমার সবটাতে বাড়াবাড়ি । মা- টা সারাদিন বাড়ি থাকে । একটা চেঞ্জ তো লাগে । একটু ফোনে কথা বলে । এই তো ।
মনে মনে ভাবলাম, তাই তো । বেবিকে নিয়ে তো কোথাও যাইও না আজ বহুকাল। মহিলার তো কোনো দাবি-দাওয়াও নেই । না শাড়ি-টা, না নাইটি-টা, না চপ্পলটা। সাজগোজ তো দূর । তাই টকটাইম ভরা মোবাইলটা তার হাতে তুলে দিয়ে বললাম,
--- নাও বাবা, যত ইচ্ছে কথা বলো । আমি কৃপণ নই । কিন্তু সাধ্য-অসাধ্য বলে তো একটা ব্যাপার আছে । তাই কটু কথা বলে ফেলেছি ।
একেবারে হাতে-পায়ে ধরে তাকে এই বুড়ো বয়সে অভিমান থেকে মুক্ত করি । আমি বরাবর নারীদেরকে ভয় পাই । বিবাহ করতে হবে, তাই করেছি । ছাত্রজীবনে কোনোদিন আমি কোনো নারী-র সংস্পর্শে আসিনি । কোথায় যেন পড়েছিলাম, একজন পুরুষ একটি মানুষের বা একটি নারীর, ঊর্‌দ্ধে  একটি অঞ্চলের ক্ষতি করতে পারে । কিন্তু একটি নারী নাকি গোটা বিশ্বকে ডুবিয়ে দিতে পারে । হেলেন অব ট্রয় মনে আছে । ফলে কে প্রেম করতে যাবে এমন বিদ্ধংসী চরিত্রের সাথে ! বিবাহ তো আর প্রেম নয় । পাঁচশো টাকা টকটাইম পেয়ে বেবি সেদিন এবং পরের দিন প্রচুর বকবক করেও, প্রচুর আল্‌তু-ফাল্‌তু বকেও টকটাইম শেষ করতে পারেননি । তাতে সে বেশ খুশি । আশ্চর্য ! এইটুকু দাবী ! এইটুকু অভিমান !
আমার সংসার বেঁচেছে । কিন্তু কার দৌলতে ? মাধব বাবু । মাধব বাবু বাঁচিয়ে দিলেন আমার প্রায় ভেঙ্গে পড়া পড়ো পড়ো সংসার । তা নয়তো আমার স্ত্রী-র ষণ্ডা-ষণ্ডা ভাইরা আছে না, তারা এই বুড়ো বয়সে আমার ছাল তুলে দিতো । নো কেস, নো কামারি। সোজা ক্যাপিটাল পানিশমেন্‌ট । সেই যে কোন সিনেমায় কে যেন অভিনয় করতে গিয়ে নাকি বলেছে একটা কথা, মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে । তেমন আর কি ।
সেই মোবাইল-টা হারালো । হারলো তো না, চুরি গেলো । প্রথমটা ভেবেছিলাম, আর কিনবো না । এর দুঃখ ভুলতে ভুলতে আমার বাকি জীবন কেটে যাবে । কিন্তু কিনতে হোল । একটা সময় ছিলো, যখন এই ফোন, মানে এক সময়ের ল্যান্ড লাইন, আর আজকের মোবাইল সেট ধনী মানুষদের আভিজাত্যের প্রতীক ছিলো । এই তো গত নয়ের দশকে এলো মোবাইল । কিন্তু আজ এটা আমার কাছে শুধু নয়, অনেকের কাছে একটা অপরিহার্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে । একেবারে খাদ্য-পানীয়ের মতো । মানুষের আজকে অল্প খেতে পেলেও চলবে, কিন্তু মোবাইল চাই । এমনকি খাদ্য-পানীয় রোজগার করতেও আজ মোবাইল । এমনকি, রিকশয়ালা তার লুঙ্গি তুলে ভেতরে পড়া শর্ট প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করে কি কি কিনে নিয়ে বাড়িতে ফিরতে হবে, তার ফিরিস্তি নিয়ে নেয় বউ-এর থেকে । মোবাইল তাই কিনতেই হবে আর একটা।
মাধব বাবুর কাছে আমার একটা ঋণ হয়ে গেলো । অকথিত, অলিখিত, আর অননুমোদিত ঋণ । সেটা জানি কেবল আমি । আর কেউ জানে না । তাই ভাবলাম, যাই, মাধব বাবুর দোকান থেকে মোবাইল-টা কিনে আনি । অন্তত একটু ঋণ পরিশোধ করতে পারবো । ইচ্ছে করলেই আমার অফিস পাড়া থেকে কিনতে পারতাম । সেখানে হাজার সেট থাকে। বেছে বেছে কেনা যায় । মাধব বাবুর দোকানে তো গুটিকয় । তবু এ তো আমার পাপ বা ঋণ স্খালনের সুযোগ দেবে । আসলে ঋণটা কী, মাধব বাবুকে বলেই দিতে পারতাম । কিন্তু আজকে এ্যাতোটা দেরী হয়ে গেছে যে, সে প্রসঙ্গ তুললে তার চোখে আমিই ছোট হয়ে যাবো । ও দোকানদার । আর আমি শিক্ষিত বাবু । তাই থাক । অন্যভাবে, মানে ঘুরিয়ে ঋণটা পরিশোধ করা যাবেখন ।
দোকানে গিয়ে এটা দেখি, সেটা দেখি । যে কটা মোবাইল ছিলো, তা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবকটাই দেখলাম । মাধব বাবু অগত্যা বললেন--- মোবাইল কিনবেন ? আপনি তো কলকাতা যান । সেখানে তো হাজার সেট পাবেন । আমার কাছে তো এই গোটা পনেরো-কুড়ি । আপনার চলবে ?
--- আরে মশাই, মোবাইল মানে তো আমি সিনেমা বায়স্কোপ দেখবো না । কল করবো, আর কল ধরবো । ব্যস। তাতে এ্যাতো বাছার কী আছে !
--- সে তো বটেই । তবে আমার কাছে কিনলে আমি আপনার একটা উপকার করতে পারি ।
--- কী, বলুন তো ?
--- আপনার হারানো যে নম্বরটা ছিলো, সেটা পাইয়ে দিতে পারি ।
--- তাই নাকি ? পারবেন ! আর টকটাইম ?
মাধব বাবু সদর্থক ঘাড় নাড়তেই আমি ফের বললাম--- তাহলে তো খুব ভালোই হয় । ঐ নাম্বারটা তো অনেককেই দেওয়া । নতুন করে নম্বর নেওয়া মানে তো আবার ডকুমেন্‌ট জমা দাও, সিম নাও, টাকা দাও, আবার খরচা করে পরকে জানাও যে, তোমার নতুন নম্বর হয়েছে ।
মাধব বাবু বললেন--- না না । আজকাল আর সিম নিতে টাকা দিতে হয় না । পেঁয়াজের দাম আঠেরো টাকা হলেও সিমের কোনো দাম নেই । এরপর তো মাংস রাঁধতে গেলে দেখবেন তাতে পেঁয়াজের বদলে সিম বেটে দিলেই মাংসটা ঝাল হয়, মেটে হয় আশিটা । কিন্তু এটা আমি করিয়ে দেবো ।
আমি বুঝলাম যে, মাধব বাবু আবার আমাকে ঋণে আবদ্ধ করছেন । তাই বলতেই হোল--- বাঁ, এটা তো বেশ সুবিধে । তাহলে তো আপনার থেকে মোবাইল না নিলেই চলে না ।
মাধব বাবু সবিনয়ে বললেন--- সেকি ! আপনারা আমার নিত্য দিনের খদ্দের । আপনাদের তো একটু কিছু পাইয়ে দিতে হবেই । না নিলেও। এটা তো আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে । তবে আমি হলফ করে বলতে পারি, আপনি যদি আমার থেকে মোবাইল নেন, তবে আমি কলকাতার দাম থেকে একটা পয়সা বেশি নেবো না । আপনি যাচাই করে দেখে নেবেন ।
আমি মনে মনে বললাম, তুমি তো জানো না মাধব বাবু, তুমি আমাকে কী পাইয়ে দিয়েছো মাসের একবারে শেশ লগ্নে । আমার পরিবারের মধ্যে যে ঝামেলার পাহাড়  ড়ে উঠতে উঠতে, আমার রাতের ঘুম কেড়ে নিতে নিতে নেয় নি, সে তোমার কৃপায় । তাতে আমি তো এমনিতেই আকণ্ঠ ঋণে নিমজ্জিত । অবশ্য তুমি জেনে বুঝে কিছু করোনি। জেনে বুঝে কেউ কারোর জন্যে কিছু করে না । জানলে তুমিও করতে না । তবুও তো করেছ । আমাকে আমার স্ত্রী এখন আর কঞ্জুস, পরশ্রীকাতর, আত্মসুখী বলে না । অন্তত কিছুদিনের জন্যে তো তার মুখটা আমি চেপে ধরতে পেরেছি । তাই আমিও সবিনয়ে বললাম,
--- যাচাই করার কী আছে ! আপনি তো পাড়ার মানুষ ।
অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো। আমি কিনলাম মাধব বাবুর সাজেশান মতো একটা মোবাইল সেট । দাম সাতাশ শো । আমি ওআলেট  থেকে টাকা গুনে গুনে দিয়ে এলাম তাঁকে । তারপর যখন মুখ ঘুরিয়ে হাঁটা দিয়েছি, মাধব বাবু পেছন থেকে ডাকলেন ।
ফিরে গেলাম । তিনি হেসে বললেন--- আপনি বোধহয় খুব অন্যমনস্ক রয়েছেন, না ?
আমি প্রশ্ন করলাম--- কেন, বলুন তো ? কী হয়েছে ?
--- আমরা দোকানদার । আমরা বুঝতে পারি, মানুষ কম টাকা দিলে অন্যমনস্ক হয়ে দ্যায় না । অন্যমনস্ক মানে বেশি পেমেন্‌ট । আপনি একটা পাঁচশো টাকার নোট বেশি দিয়েছেন । বস্তুত সেদিন অফিসে একটা ফাউ পেমেন্‌ট পেয়ে গিয়েছিলাম । এটাকে উৎকোচ না বলাই ভালো । দোকানে গিয়ে মনে মনে ভেবেছিলাম যে, উৎপাতের ধন আজ চিতপাতে যাক । তাই টাকাটা বেশীই দিয়ে দি-ই মাধব বাবুকে । আমি তো পাপ স্খালনের জন্যে টাকা-টা দিয়েছিলাম । ভেবেছিলাম, লোকটা বোধহয় টাকা-টা তেমনভাবে গুনে-টুনে দেখবে না । আমি অঞ্চলের মানুষ । তায় বিশিষ্ট ভদ্রলোক । এমনকি তাঁর দোকান থেকে নয় নয় করে সাতাশ শো টাকা দামের মোবাইল কিনেছি । সেই মানুষ পেমেন্ট করছে । চুপচাপ টাকা-টা নিয়ে নেবে । কিন্তু সে যে গুনে নেবে, তা অনুমান করিনি । তদুপরি ভেবেছিলাম, যদি টাকা গোনেও, তবে হয়তো এ্যাতোগুলো টাকা বেশি দেখে প্রাণে ধরে ফেরত দেবে না।  দোকানদার মানুষ । সামান্য মার্জিনে কারবার করে । টাকা-টা চুপচাপ পার্সে ঢুকিয়ে নেবে । অন্তত আমি তো ফেরত দেবার পার্টি নই । তাই মৃদু হেসে বললাম,
--- আপনি গুলিয়ে ফেলেছেন । আপনার ক্যাশবাক্সের পাঁচশো টাকার নোটের সাথে মিলিয়ে ফেলছেন ।
--- না না । টাকা-টা তো আমি ঢোকাইনি । তাছাড়া আমাকে পাঁচশো টাকা-র নোটে কেউ আজকে পেমেন্‌ট করেওনি । ক্যাশবাক্সে আসবে কোথা থেকে ?
--- আপনি শিয়্যোর ? আমি তো টাকা এ.টি.এম. থেকে তুলেছি । সেখানে বেশি দেবে কী করে !
কিন্তু টাকা টার নম্বরটা আমাকে ধরিয়ে দিলো যে, ওটা আমার ই টাকা । আমি তো টাকা-টা এ.টি.এম. থেকে তুলিনি । এটা ব্যাঙ্ক থেকে কালেক্ট করা সেই ফাউ টাকা-র বাঞ্চ থেকে আমি দিয়েছি । আজও আমি বলতে পারিনি যে, ওটা আমি ইচ্ছে করে দিয়েছি । আমি মুক্তি চাই । এই বোঝাটা আমি বেশ কিছুদিন ধরে বয়ে বেড়াচ্ছি । এবার নামাতে চেয়েছিলাম । কিন্তু পারলাম না । মাধব বাবুর কাছে ধরা পড়ে গেলাম । মাধব বাবু তখনও হাসছেন । একটা মলিন হাসি । এই মলিন হাসিটা কিছুদিন ধরেই তার ঠোঁটে ঝুলছে, দেখেছি । আগে এমনটা ছিলো না । এখন পাড়ার দোকানদার, পোস্টম্যান, মাসে মাসে আসা গ্যাস ডেলিভারার, তিনমাস অন্তর আসা ইলেকট্রিক মিটার রিডার, বা বৃষ্টিতে কাকভেজা ভিজে যাওয়া চুপচুপে হয়ে কদাচিৎ আসা ক্যুরিয়ারের ছেলেগুলোর ব্যক্তিগত জীবনে কী কী ঘটলো, সে কে-ইবা খবর নেয় ! ফলে জানতে চাইনি কোনোদিন, আপনার কী হয়েছে । বেশ তো একটা মিষ্টি হাসি দিতেন দোকানে কাস্টমার এলে ! আজকাল এমনটা কেন ? বলে দিলেন মাধব বাবু নিজেই ।
আমার কথা শুনে শুকনো হাসি হেসে বললেন--- জানেন সন্দীপ বাবু, কত মানুষ দেখি এই ছোট্ট দোকানটাতে বসে বসে । যেন বিশ্ব দেখি । তাদের কত না চরিত্র, কত না মানসিকতা ! আপনাকে তো দেখছি এ্যাতদিন । জানেন, ক-দিন আগে কে যেন ফোনে রিচার্জ করতে এসেছিলো । বোধহয় তেত্রিশ টাকা চেয়েছিল । আমি এ্যাতোটা অন্যমনস্ক ছিলাম  যে, আমি ভুল করে পাঁচশো তেত্রিশ টাকা রিচার্জ করে ফেলি । লোকটা কিন্তু চলে গেলো । কে যে সে-টা আমি হদিস করতে পারলাম না । সে কিন্তু ফিরে এলো না । আর আপনি পাঁচশো টাকা আমাকে এভাবে পাইয়ে দিচ্ছেন । মানুষ কত রকমের হয় !
আমার গা-টা কাঁটা দিয়ে ওঠে এই কথায় । আমি সন্দেহ নিরসনের জন্যে বলি--- আপনি তার নাম্বারটা দেখেন নি ? সে নাম্বার তো আপনার রিচার্জ করার মোবাইলে আছে।
--- এটাই তো ভাগ্যের পরিহাস, মশাই । সেদিন ভুল করে আর একটা কাজ আমি করে বসি । ঐ মোবাইল-টা দোকানেই থাকে । অনেক টাকা ওতে ভরা থাকে তো । সঙ্গে নিই না । যদি কোথাও হারিয়ে যায় । আজকাল যা মোবাইল চুরি হয় ! কিন্তু সেদিন ভুল করে সেটা পকেটে ফেলে বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে পড়ি । হাসপাতালে যাচ্ছিলাম । সেটা যে কাছেই আছে, সাবধান হতে হবে বৃষ্টিতে, তা তো মনে ছিলো না । পুরনো কমদামী মোবাইল । জলে ভিজে সেটা শেষ । যে টাকা ভরা ছিলো, সেটা তো পেয়ে গেছি কোম্পানী থেকে । কিন্তু সেই পাঁচশো টাকা কাকে দিয়েছি, তার খবর নিতে পারিনি । সে বড়ো ঝামেলা । তাছাড়া জানলেই কী ! কত মানুষ এখান দিয়ে যায় । সবাই তো পাড়ার নয় । পাড়ার মানুষ তো এমনটা করবেনা । তাই তার হদিশ পাবো কী করে ? সেদিনই টাকাটা বড়ো দরকার ছিলো । কিন্তু আজকে এই অতিরিক্ত টাকাতো আমার কাছে নিতান্ত নিষ্প্রয়োজন ।
টাকা দরকার নেই ! এ কথা এই প্রথম শুনলাম । মনে হলো, টাকা কি শুধু দরকারি ? টাকা মানে টাকা । এলেই তা পকেটে রাখতে হয় ।  টাকা কি দরকারের জন্যে মানুষ আয় করে নাকি ! তাছাড়া মানুষের দরকারের তো কোন লিমিট থাকে না  । রতন টাটা কি মনে করে, তার এ্যাতো টাকা আছে । আর দরকার নেই । তাই বললাম,
--- আপনি এ্যাতো অন্যমনস্ক ! তাহলে দোকান চালান কী করে ? পদে পদে তো এমন নানা ঘটনা ঘটবে ।
মলিন হাসি দিয়ে সে বলে--- না । তা ঘটে না । আর ঘটবেও না । আসলে সেদিন আমার স্ত্রী চলে গেলেন ।
--- চলে গেলেন ! কোথায় ? আমি বোকার মতো প্রশ্ন করি ।
ভদ্রলোক দোকানে একটা মহিলার ছবি আঙ্গুল দিয়ে দেখালেন । দেখলাম, তাতে নতুন মালা দেওয়া, চন্দনে চর্চিত । কোনো কথা যোগালো না মুখে । শুধু বলতে হয়, তাই বললাম--- ও ! বেশ সুন্দরী ছিলেন আপনার স্ত্রী।
মাধব বাবু তার উত্তর না দিয়ে বললেন--- ক্যান্সার । এবার বলুন তো, এই বেশি টাকা নিয়ে বা আপনার কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে আজ আমি কী করবো ? আমার খরচ তো তিনি ছেড়ে চলে গেছেন ।
লে টাকা-টা আমার হাতে গুঁজে দিলেন । মাথা নিচু করে নিলাম টাকা-টা স্বীকার করতে পারলাম না যে, আমি কোনো মহাপুরুষ-টুরুশ নই । অপরাধ করার থেকে অপরাধ স্বীকার করে নেওয়া যে অনেক কঠিন, সেটা আমি হাড়ে হাড়ে সেদিন উপলব্ধি করলাম । আজ পাপ স্খালনের জন্যে এসেছিলাম । কিন্তু পারলাম না । আমি যে ভদ্রলোক ! কী করে বলি সত্যি কথা-টা ! তথাকথিত ভদ্রলোকরা যে সত্যি বলতে জানে না । পথেঘাটে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যি কথা বলতে পারে না, আদালতে কোনো অন্যায়ের শিকার হওয়া মানুষের সমর্থনে সত্যি বলে তার পাশে দাঁড়াতে পারে না, অন্যায় করে স্বীকার করতে পারে না, তর্ক করে, আমিই ঠিক । আমিই তো সেই ভদ্রলোক । মাথা নিচু করে বাড়িতে এলাম । এই পাঁচশো টাকায় তো আমি কপালবশত সেদিন আমার ক্ষেপে ওঠা স্ত্রী-কে খুশি করেছি । সে নানা মানুষের সাথে আল্‌তু-ফাল্‌তু কথা বলেছে । যার সাথে কস্মিনকালে কোনো সম্পর্ক নেই, তার হাঁড়ির খবর নিয়েছে, আর আমাকে ভেবেছে পতি পরমেশ্বর। অকারণ টকটাইম বাড়িয়ে নিয়েছে । আর আমি ? আসলে আমি আমার টকিং পাওয়ার হারিয়েছি । আমি চুরি করেছি।

------------------

শুক্রবার, ৭ অক্টোবর, ২০১১

'প্রত্যর্পণ' ছোটগল্প


প্রত্যর্পণ

হিমাদ্রি বন্দ্যোপাধ্যায়

বেলা প্রায় সাড়ে এগারোটা । জগন্ময় বাবু-র বাড়ি-র একেবারে সামনে, অর্থাৎ পরিস্কারভাবে বললে বলতে হবে যে, খোদ জগন্ময় বাবু-র বাড়িতেই একটি টাটা-৪০৭ গাড়ি এসে থামল, যাতে রয়েছে বাড়িতে ব্যবহার্য নানা বৈদ্যুতিন এবং অন্যান্য নানা আধুনিক ও অত্যাধুনিক পণ্যদ্রব্য, যা জগন্ময় বাবু ও তাঁর পরিবার দেখে পরিষ্কার চিনতে পারলেন । কিন্তু পরিষ্কার হতে পারলেন না, এগুলো কী কারণে তাঁদের বাড়িতে ফিরে এলো। গাড়িটা থামল আর তা থেকে নামলেন স্বয়ং পরিতোষ গাঙ্গুলি । পরিতোষ গাঙ্গুলি জগন্ময় বাবু-র সদ্য আত্মীয়তা-বন্ধনে আবদ্ধ কুটুম, অর্থাৎ আরো স্পষ্ট করে বললে তিনি জগন্ময় বাবু-র সাম্প্রতিক বেহাই মহাশয় । বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে । গাড়িটা দাঁড়াতে বাড়ির সকলের দৃষ্টি আকৃষ্ট হল সেদিকে । এদিকটাতে তো নেহাৎ কেউ নতুন বাড়ি-টারি করে শিফ্‌ট করা ছাড়া গাড়ি নিয়ে ঢোকে না । ঢোকার জায়গাই নেই । বড়োজোর একটা টাটা-৪০৭ কোনোভাবে ঢুকতে পারে । তাই প্রায় সকলে, এমনকি বাড়ির ঠিকা ঝি পর্যন্ত বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো, ব্যাপারখানা কী । জগন্ময় বাবুও বাড়িতে উপস্থিত । সকলের চোখ চড়কগাছ । সাত সকালে হচ্ছেটা কী ! পাড়ার মানুষ কী বলবে! এবার তো সকলেই দেখবে । গাড়িতে যে মালপত্র আছে, তা কেউ কখনও ফেরত দিয়েছে, এমনটা শোনেনি কেউ, দ্যাখেনি বা গল্প-উপন্যাসেও পড়েনি পর্যন্ত । না, পরিতোষ বাবু তো মানুষটা মন্দমানুষ নন্‌ । এসব তো তিনি নিতেই চাননি । তিনি বেশ আধুনিক আর সজ্জন মানুষ । তাঁর থেকে এমন আচরণ অপ্রত্যাশিত তো বটেই, কল্পনাতীত। তবে কি সরষের মধ্যেই ভূত ছিলো ? এগুলো কি পছন্দ হয়নি, নাকি ? কিন্তু তাহলে এ্যাতদিন বাদে ? দেখতে হচ্ছে কী ব্যাপারটা ।


অঞ্জলি-র জন্যে একটার বেশি দুটো সম্বন্ধ দেখতে হয়নি হয়নি জগন্ময় বাবুকে । প্রথম এ্যাপয়েন্‌মেন্‌ট-ই পরিতোষ বাবুর সঙ্গে, আর এটাই ফাইনাল । তবে একথা ভাববার কোনো কারণ নেই যে, অঞ্জলি এমন সুন্দরি, তাকে দেখে পাত্র তো পাত্র, পাত্রপক্ষেরও মাথা-উথা ঘুর গিয়া অবস্থা । বরং অঞ্জলি একটি অত্যন্ত সাধারণ মেয়ে । সাধারণ গা-এর রং, সাধারণ তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, চুল, চোখ, উচ্চতা ইত্যাদি যা যা পাত্রপক্ষকে দেখে-টেখে নিতে হয়, তার কোনটাই বাহ্‌বা দেবার মতো নয় । বরং পরিতোষ বাবু-ই বাহ্‌বা পাবার যোগ্য । তিনি জগন্ময় বাবুকে বললেন,
--- এটা শুধু আপনার প্রথম ম্যারিটাল এ্যাপয়েন্‌টমেন্‌ট নয়, জগন্ময় বাবু । আমাদেরও ।
--- তাই নাকি ! সেটা তো আমার মেয়ের সৌভাগ্য । আপনাদের ছেলে তো সত্যি-ই সুকুমার । আপনি ইচ্ছে করলে আরো অনেক ভালো পাত্রী পেতেন । তাছাড়া ভালো চাকরী, আপনার মতো সজ্জন পিতা তার । সেখানে তো আমার মেয়ে সামান্য, অতি সাধারণ । তবে আপনি দয়া করে বাবাজীবনের একেবারে ভেতরের কথাটা জেনে নেবেন । সে হয় তো বাবা-র ব্যক্তিত্বে এ সম্বন্ধটা মেনে নিতে বাধয় হচ্ছে । হতেও তো পারে । আমার কিন্তু ভয় হচ্ছে । আজকাল তো ওদের মতের একটা বিরাট অর্থ এসে দাঁড়িয়েছে ।
পরিতোষ বাবু চোখ থেকে নিজের চশমাটা খুলে একবার জগন্ময় বাবুর দিকে চেয়ে নিলেন। তারপর বললেন--- আপনি আমাকে কী ভাববেন, জানিনা মশায় । আমি কিন্তু এ ব্যাপারে একেবারে গোঁরা প্রকৃতির মানুষ । ছেলেদের বিয়ে দেবো, ঠিক আছে । কিন্তু পরিবার-টা আমার । আমি তার প্রধান । সেখানে অন্যদের তেমন কথা-টথা আমি বলতে দেই না । দিলেই বিপদ । গণতন্ত্রের অনেক জ্বালা । যত মত তত পথ । মানে, নানা মুনির নানা মত । মানে ? কোন মত-ই কাজ করছে না । মানে ? ঢোল বাজছে কিন্তু নাচা যাচ্ছে না । তবে বাজিয়ে লাভ কী ? তার চেয়ে একজন-এর মত-ই ভালো ।
--- ও!
হাঁ করে শোনেন জগন্ময় বাবু। -এর বেশি কোনো শব্দ করতে পারেন নি তিনি । বুঝে নিয়েছেন যে, এটা কঠিন ঠাঁই । তবে তিনি বিস্মিত এটা জেনে যে, আজও পরিতোষ বাবুদের একান্নবর্তী পরিবার । বিয়ে করলেই যে ছেলেরা বাবা-মাকে ছেড়ে পালায়, সেটি এখানে খাটছে না । তিনি নিজেও অবশ্য চান না এমনটা । আজ-কালকার ছেলেদের বিশ্বাস নেই কোন । যে কোন ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারে । কিন্তু যদি এমন একটি শ্বশুর তার মেয়ের থাকেন, তবে চিন্তা আর কী ? এ তো বন থেকে ধরে আনা বাঘ ।
--- তাছাড়া, দেখুন । বিবাহ শুধু দুটি নারী-পুরুষের মিলিত সম্বন্ধ নয় । দুটো পরিবার, দুটো সমাজ, দুটো সংস্কৃতি আর দুটো সংস্কার এর মাধ্যমে মিলে যায় এক বন্ধনে । এ সম্বন্ধ পাকা হলে আপনাদের সম্মান আমাদের, আমাদের সম্মান আপনাদের। বিশেষ করে আমার ওপরে ওদের ভরসা আছে । ছোটো-টা তো তার বউদিকে দেখছে । সে তো আমারই পছন্দ । কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায় ।
--- বলুন । আপনার কী প্রশ্ন ?
--- আপনারা তো যথেষ্ট বিত্তশালী পরিবার । আমাদের মতো ছা-পোষা পরিবারে কি আপনার মেয়ে বিয়ে দেওয়া সমীচীন হবে, জগন্ময় বাবু ? আমি তো আপনাদের অবস্থা জেনে আসিনি । এসে দেখছি, এগোনো ঠিক হবে না ।
ব্যস্ত হয়ে ওঠেন জগন্ময় বাবু । ক্যানো ? এমনটা মনে হচ্ছে ক্যানো ? আমরা কি আপনাদের সামনে আমাদের বিত্তের কোন গরিমা প্রকাশ করেছি ? তাছাড়া লক্ষ্মী তো চঞ্চলা । আপনার ছেলেদুটি তো সবে চাকরী পেয়েছে। দেখতে থাকুন ।
--- বলছেন ?
--- তাছাড়া আপনাকে আমার মনে ধরেছে । এখানে আমার মেয়ে-র বিয়ে হলে সে একটা ভালো পরিবেশে থাকবে, আমাকে মেয়ের বাপ হয়ে বিবাহোত্তর নানা দুশ্চিন্তায় পড়তে হবে না । শান্তিতে মরতে পারবো অন্তত । আজকাল তো শোনেনই, কতই না ঘটনা ঘটছে । ভয় লাগে । তাই বলে মানুষের পেটের মধ্যে ঢুকে যেমন তাকে যাচাই করতে পারি না, তেমনই মেয়ের বিয়ে তো দিতে হবেই । আর যদি আমার মেয়ের কথা বলেন তো, বলি । আমার মেয়ে তো কোন বিরাট কোন বিদুষী নয়, অপ্সরাও নয় । বিত্ত তো আছে ওর বাবার । ওর তো নয় । আপনিই বলুন, শুধু ধনে কি কাজ হবে, পরিতোষ বাবু ? আপনি কি আপনার মেয়ের বিয়ে ধনৈশ্বর্য দেখে দিয়েছিলেন ? একটা ভালো ফ্যামিলি, ভালো জীবনসঙ্গী--- এই তো চাই । জীবনে সুখ না পাক, আনন্দ যেন পায় ।
--- বা ! বা !! বেশ বলেছেন । সুখ না পাক, আনন্দ যেন পায় । এবারে বলুন তো, সুখ আর আনন্দের এই তফাৎ কি ওরা, মানে এই প্রজন্ম বোঝে ? ওদের মতের কী দাম ! নিন, আমি রাজী ।
--- তাহলে হয়ে যাক ।
--- হ্যাঁ, হয়ে যাক ।


বিবাহ ঠিক হয়ে গেছে । পরস্পর পরস্পরকে মিষ্টিমুখ করিয়েছে । মহিলামহলে হাসি-হুল্লোড়ের মধ্যে জগন্ময় বাবু আসল বিষয়টি তুলেছেন--- পরিতোষ বাবু, এবারে আসল কথাটা হোক ।
--- কোনটা বলুন তো ? হয়েই তো গেলো । আকাশ থেকে পড়েন পরিতোষ বাবু ।
--- বিয়ের ব্যাপার, মশাই । এ্যাতো তাড়াতাড়ি কি হবে ? সাত কথা না হলে কি বিয়ে হয় ? এবারে বলুন তো আপনাদের দাবি-দাওয়া কী ।
ঝুলে পড়ে পরিতোষ বাবু-র মুখ। কী বলবেন, ভেবে পান না। কীভাবে উত্তর দেওয়া যায়, তার আগা-মাথা বুঝতে পারলেন না । পরে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন--- আমাদের একটাই দাবি । দয়া করে বিয়েতে মেয়ে ছাড়া অন্য কিছু দেবেন না। আমাদের মেয়েটিই চাই । ব্যস ।
--- বা বা বা ! সে তো ভালো কথা । তবু তো একটা কর্তব্য আছে আমার । অবশ্য পাত্রপক্ষ-কে আমি চাইবার কোনো সুযোগ দেবো না । চাইবার বেশি-ই দেবো আমি ।
প্রতিবাদ করেছেন পরিতোষ বাবু--- না, জগন্ময় বাবু । দয়া করে ওটাও করবেন না ।
--- সে কি বলছেন ! আমাদের তো একটা সমাজ আছে, পাঁচজন আত্মীয়-পরিজন আছে, নিমন্ত্রিত মানুষজন আছে । অন্তত ঘরের মহিলারা তো আছে । তাদের মুখে মুখে তো ঢি ঢি প'ড়ে যাবে, পরিতোষ বাবু । আমার গায়ে তো তারা স্ট্যাম্প মেরে দেবে, আমি আমি কিপটে বুড়ো, হাড় কেপ্পন, তারপর আজকাল ঐ যে 'মক্ষীচুষ' না কি বলে যেন । এসব গঞ্জনা সইতে হবে । এটা হয় কী করে ? এটা আমার বাড়ির শেষ কাজ । নমো নমো করে কীভাবে সারি বলুন তো ? তাছাড়া আমার বড়ো মেয়ের বিয়ে দিয়েছি । তাকে তো নানা যৌতূক দিয়েছি । সে সব যদি ছোট মেয়েকে না দিই, তো তার কাছে আমি ছোটো হয়ে থাকবো । সেটা কি…..
--- তাই বলে এভাবে বড়ো হওয়া কিনবেন ?
--- কোনো উপায় নেই। এইভাবেই কিনতে হয়, দাদা । যস্মিন দেশে যদাচারঃ। আপনিও এভাবেই কিনেছেন ।
মৃদু হেসে টেবিল থেকে জলের গেলাস-টা তুলে নিয়ে ঢক ঢক করে গোটা-টা গলায় ঢেলেদিলেন পরিতোষ বাবু । তারপর বলেন--- না, আমার মেয়ে বা বড়ছেলে, কারোর ক্ষেত্রে এসব দেওয়ানেওয়া ঘটেনি । দুটি ঘটনাই ঘটেছে আমার ছোটোবেলাকার দুই খেলার সাথীর পরিবারে । আপনি ঠিকই বলেছেন । সেই বিবাহ দুটি ঘটেছে কেবল পরিবার দেখে । আমাদের দিকটা ভাববেন না । ওক্ষেত্রে আমাদের বড়ো হওয়া থেকে আত্মীয়তা-টাই বড়ো হয়ে উঠেছিল । তাই আপনার প্রস্তাব মানতে পারছি না । বস্তু বড়ো ভয়ের জিনিস । মানুষকে অমানুষ করে দ্যায় ।
এবারে পরিতোষ বাবুর দুটি হাত ধরেন জগন্ময় বাবু । একেবারে অনুনয় করে বলেন--- আমাকে বাঁচান আপনি । এভাবে এই সম্বন্ধ টা ভেঙ্গে দেবেন না । আমাকে আমার মেয়ের কাছে, বা মেয়ের মায়ের কাছে ছোটো হতে দেবেন না । আপনিই তো বললেন, আমার সম্মান আপনার সম্মান । আমি তো পণ দিচ্ছি না । আর আপনিও তো চাইছেন না । কিন্তু বাবা কি তার মেয়েকে হাতে ধ'রে কিছু দিতে পারে না ? এই কি আপনার বিচার !
বাধা দিতে পারেননি পরিতোষ বাবু । বুঝতে পেরেছেন যে, তিনি হয়তো যেমন করে জীবনটাকে দেখেন, তেমনটা করে দেখতে পারেন না জগন্ময় বাবু । হতেই পারে । কী আর করা যাবে ! হাতের পাঁচটা আঙ্গুল তো একই রকম হয় না । ভদ্রলোকটির সাথে যতই কথা বলেছেন, ততই তাঁকে আরো বেশি করে শ্রদ্ধেয় মনে হয়েছে । যে বাড়ির বিত্তবান পারিবারিক প্রধান এমন বিনয়ী, সে বাড়ির অন্যান্য সকলে হুবহু না হলেও তাঁর ধারে কাছে টো বটেই। থাক, যদি বাবা মেয়েকে কিছু যৌতুক দিতে চান, দিন । বস্তুটার কোন দাম তো থাকে না যদি মানুষটা ভালো হয় । ব্যক্তিরই তো মূল ভূমিকা । মানুষ বস্তু নিয়ে যখন মাতামাতি করে, তখনই তো বস্তু এসে মানুষের মাথায় ওঠে । বস্তুকে বস্তুর মতো থাকতে দিলেই হয় ।



তাই বিবাহ হয়ে গেছে মহা সমারোহে এবং সত্যিই জগন্নাথ বাবু যৌতূক হিসেবে যা যা দিয়েছেন সাজিয়ে, তা সবটা দাবি-দাওয়া করে নেওয়া সম্ভব নয় । এর অনেক কিছুর নাম এবং ব্যবহার তিনি নিজেই জানেন না । সব অত্যাধুনিক ব্যবহার্য সামগ্রী । যে টেলিভিশন-টা জগন্ময় বাবু দিয়েছেন, তেমনটা যে টেলিভিশন আদৌ হয়, তাই তিনি জানতেন না। এ যেন দেওয়ালে টাঙ্গানো একটা ক্যালেন্ডার। অবশ্য বাইরের জগতের কতটুকুই বা তিনি জানেন ! তিনি যে বিদেশী কোম্পানী-তে উচ্চ পদে কাজ করতেন, তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো । সে তো আজ ইতিহাস। কিছুদিন চালিয়েছেন জমা টাকায় । সে বয়সে তো নতুন করে চাকরী পাওয়া দুরাশা । বড়ো ছেলে বড়ো ছেলের মতো কাজ করেছে সে সময় । সারা দিনরাত ছাত্র পড়িয়ে নিজের পড়াশুনো, ভাইবোন-এর পড়াশুনো আর সংসার চালিয়েছে । আজ এ বাড়ি একটু সুখের মুখ দেখছে । দারিদ্রের মহিমা বুঝতে পেরে তিনি বড়ো ছেলের বিবাহ-ও দিয়েছেন দরিদ্র পরিবারে । তাঁর-ই কোলিগ। কোম্পানী বন্ধ হতে তিনি সর্বহারা হয়ে গিয়েছিলেন। প্রকৃত একজন কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা-কে তিনি উদ্ধার করেছিলেন ।
ফলে পরিতোষ বাবু পড়ে আচ্ছেন সেই উনিশ-শো চল্লিশ সালে । প্রাচীন মূল্যবোধ, প্রাচীন মানবিকতা, আতিথেয়তা, অর্থাৎ পুরনো দিনের যা কিছু, তা তাঁকে টেনে রেখেছে পেছনে । তিনি তা ভুলতেও চান না । তবে তিনি অন্ধের মতো চলেন না, বা অন্ধের মতো কোনকিছু মানেন না । পেটে যে তাঁর শিক্ষা আছে, তা তাঁর সাথে বাক্যালাপ করলেই বোঝা যায় । তিনি আধুনিক ভোগ্যপণ্য বলতে একেবারে অজ্ঞ । আসলে যারা শেয়ার বাজার নিয়ে বিকিকিনি করেন, তারাই জানেন ভালো, রিসেশন কী, বা তার ভয়ানকতা কোথায় । আদার ব্যাপারী কি আর জাহাজের খবর রাখে! জানার কি কোনো শেষ আছে! সবাই তো সবটা জানতে চানও না। তাঁদের জানার দরকার থাকেও না । হিন্দিতে বলে, আদমি, আপনি কুরতে মে রহো। তবে আজকাল মহিলারা যে উইন্ডো শপিং করে-টরে বেড়ায়, তাতে তারা এসব পণ্যদ্রব্যের খবর-টবর রাখে ।




এ বাড়িতে নব পরিণীতা বধু এলো । তার সাথে এলো নানা ভোগ্য পণ্যও । সেগুলো গিয়ে জমল ছোট ছেলে বিপ্র-র ঘরেই । এমনকি রান্নাঘরের জন্যে মাইক্রোওভেন, ও.টি.জি., ফব্‌স ইত্যাদি  নামে যা কিছু অত্যাধুনিক সামগ্রী এলো, সবই ছোট বৌ জমা করলো তার নিজের ঘরে। যেন তা নিতান্তই স্বর্ণালঙ্কার, নিতান্ত ব্যক্তিগত । এ বাড়ির সংস্কার তো সে জানে না। পরিতোষ বাবু কিছু না জানলেও তাঁর স্ত্রী মহামায়া গোটা-টা নীরবে দাঁড়িয়ে দেখলেন ।  এও দেখলেন যে, এ বিষয়ে কনিষ্ঠাত্মজ শ্রীমান বিপ্রদাস একেবারে নীরব । তিনি শুধু মুচকি হাসলেন । ভাবলেন, নতুন সংসার করতে এসেছে মেয়েটা। হয়তো অনেককিছু জানে না, বা বোঝে না । এটা আমার ওটা তোমার বলার মধ্যে যে একটা হীন স্বার্থবুদ্ধি জড়িয়ে থাকে, তা থেকে বড়ো বড়ো মানুষই মুক্তি পেলো না, তাতে এ তো ছোট একটি মেয়ে ! বাচ্চামানুষ । সব ঠিক হয়ে যাবে ।
কিন্তু বিষয়-টা সোনা সোনা পর্যায়ে থাকলো না । বাবা সজ্জন হলেই যে সন্তানকে সজ্জন হতেই হবে, তার যে কোনো মানে নেই, তা এ বাড়ির মানুষ বুঝতে পারলো অচিরেই । বিশেষতও, গর্ভধারিণী যদি বিপ্রতীপ প্রশিক্ষিকা হন, তাহলে কিছুতেই কিছু হয় না । ছোট বৌ অঞ্জলি মোটেই তার শ্বশুরবাড়ি-কে চিনতে পারেনি । তার জীবনসঙ্গীও তাকে তেমনটা জানায়নি । এখানে যে মানুষগুলো আলাদা আলাদা স্ত্রী-সন্তানের অধিকারী হলেও একটা অচ্ছেদ্য বন্ধনে তারা আবদ্ধ, এবং ততদিন তেমনটা থাকবে, যতদিন পরিতোষ বাবুরা বেঁচে আছেন--- তেমনটা মেয়েটি ধরতেই পারলো না । সে এ বাড়ির মানুষ হয়ে উঠতেই চাইলো না । তাই যে সংসারের বৃন্দগানে সে যুক্ত হতে এসেছিলো, সেখানে সে সকলের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে নয়, বরং তার একান্ত আপন কণ্ঠে, আপন তার-এ, আপন গায়কী-তে গান গাইতে লাগলো । অসংলগ্নতা আসতে অন্য গায়ক-গায়িকারা যে বারে বারে বিস্মিত হয়ে তাকাচ্ছিলো, সেটা সে দেখতেই চাইল না । বারবার তানপুরার তার কাটছিল, সমড়ছিল ভুল জায়গায় । অনেকের কানে সেই একক উচ্চকিত কণ্ঠ বেকায়দা লেগেছে । তাই প্রথমদিকে পরোক্ষভাবে ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলেওছিল । পরে তা হোল প্রত্যক্ষ, সরাসরি, তিক্ত আর বিষময় ।



প্রথম ঘটনাটা ঘটলো রাখি উৎসবের দিনে, এ বাড়ির মেয়ে টুকটুকি তার দুইভাই-কে রাখি পড়াতে এলো । মেয়ে টুকটুকি-র একমাত্র ছেলে এখানে দেওয়ালে টাঙ্গানো টেলিভিশন দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে দিয়েছে চালিয়ে, আর তার সাথে করে নিয়ে আসা প্রিয় ভি.ডি.. গেম্‌স জুড়ে দিয়েছে । আজকের শিশু । প্রযুক্তি-টা বড়ো ভালো বোঝে । যেটা বড়ো-রা জানে না, তারা তা অনায়াসে করে দেখায় মোবাইলে বা টেলিভিশনে । ছোট বৌ অঞ্জলি বাড়িতে ছিলো না । সে তার সাজসজ্জা-র দ্রব্য কিনতে গিয়েছিল দোকানে । ফিরে এসে ঘটনা-টা দেখতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে,
--- কেন তুমি এটা চালিয়েছো, দুষ্টু ? তুমি জানো না, ছোটদের সবটাতে হাত দিতে নেই ?
নিষ্পাপ কণ্ঠে সে জানিয়েছে--- আমি তো পারি । আমাদের বন্ধুদের বাড়িতে প্লাজ্‌মা আছে তো । আমরা তো চালাই । খেলা দেখি ।
--- যেখানে চালাও, চালাও । বাচ্চাদের এসব দামী জিনিসে হাত দিতে নেই । আর ভি.ডি.. গেম্‌স তো খেলতেই নেই । যাও, বাইরে খেলো গে ।
এ কথা বলে সে দিয়েছে টেলিভিশন বন্ধ করে । দমে গেছে এ বাড়ির আদরের শিশু যার এখানে অবাধ রাজত্ব ছিল । বিষয়টা সে ভালো চোখে নেয় নি ।  আজকের সন্তান । হা করতে রা বোঝে । আজ যে এখানে তার রাজ্যপাট যেতে বসেছে, এটা অনুমান করেই বৃদ্ধ সম্রাট-এর কাছে সে অভিযোগ জানিয়েছে । বৃদ্ধ সম্রাট নতুন যুবরাজ কে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন,
--- দাদুভাই, তুমি তো আর ছোটটি নেই । তুমি তো অনেক কিছু বোঝো । এটাও জেনে রাখো, কখনও নিজের ঘরে ছাড়া অন্যের ঘরে কোনোকিছুতে হাত দিতে নেই । তাতে যে নিন্দে হয়, ভাই । মাইমা যখন বলেছেন, এতে গেম্‌স খেললে ওটার ক্ষতি হবে, তাহলে নিশ্চয়ই তাই হবে । সে তো বড়ো । সে তো জানে ।
নিউক্লিয়াস পরিবারের শিশু তো এর অর্থ অনুধাবন করতেই পারেনি । বরং দাদু-কে সে মাইমা-র সমর্থক ভেবে নিয়েছে । তাই সে খুশি হয় নি । কিন্তু বিষয়টা আপাতত বেশিদূর গড়াতে পারেনি । এভাবে ছোট-বড়ো অনেক জিনিস কাটিয়েও দেওয়া গেছে । এরই মধ্যে পাশের বাড়ির পরেশ বাবু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন । প্রতিবেশী বলে কথা । মহামায়া দেবী ছোটবউ-কে এসে বলেছেন,
--- বউমা, তোমার ঘরে ঐ যে মশলা করা জিনিসটা আছে না ? কী যেন নাম……ওটার । আমার তো ছাই মনেও থাকেনা । ওটা একটু দাও না । পাশের বাড়ির পরেশ বাবু অসুস্থ হয়ে পড়েছেন । ওঁকে ডাক্তারবাবু খাবার-দাবার, ওষুধ সব পিষে খাওয়াতে বলেছে । হাতে আর কত করবে বুড়ি মানুষ ! কটাদিন । মাস পড়লেই ওরা কিনে নেবে, বলেছে ।
মহামায়া দেবি-র এটা বলার পেছনে একটা যুক্তি ছিল । তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, সত্যি সত্যি ছোট বউমা কী বলে । কেননা ছোট ছোট অনেক ঘটনা ঘটেছে ইতিপূর্বে । এটি তারই একটি পরীক্ষা । এক সময়ের ঠাকুমা-দিদিমা, পরে দূরদর্শনের নানা ধারাবাহিক কাহিনী মহিলাদের মধ্যে এসব বৈশিষ্ট্য ঠুসে দিয়েছে । আজকাল সবাই সিরিয়ালের ভ্যাম্প হয়ে উঠতে তৎপর হয়েছে। তাই পরীক্ষার একটা সিদ্ধান্তে তিনি আসতে চেয়েছিলেন । ছোট বৌ গ্রাইনডারটা দিয়েছে বটে, কিন্তু তার সাথে একটা মন্তব্য জুড়েও দিয়েছে,
--- জানেন মা, কিছু লোক আছে, যারা ঘোড়া দেখলেই খোঁড়া হয় ।
ইঙ্গিত বোঝেন শাশুড়ি মা। তিনি বলেন--- না, আমি কোন কথা-টথা দেইনি, বউমা । এমনকি বলিওনি যে, আমাদের আছে । ওরা কিন্তু তোমার শ্বশুরমশাই অসুস্থ হলে অনেক করেছিলো।
--- সবাইকে কি আপনি এনটারটেইন করতে পারবেন, মা ? যদি মেশিন-টার কিছু খারাপ-ভালো হয়, তখন মুখটা বেজার করে থাকবে ওরা । আপনি না পারবেন বলতে, না পারবেন সইতে ।
সমুচিত কোনো উত্তর দেননি মাহামায়া দেবী । শুধু বলেছেন--- তাহলে খারাপ আছে বলে দি-ই ? কী বলো ?
--- না, নিয়ে যান । তবে সবাইকে সবটা জানাবেন না । আজকাল কে কার তবিল সামলায়, বলুন তো?
মহামায়া দেবী এটাও পরিতোষ বাবু-র কানে তোলেননি। আর একটু দেখা যাক । আর একটু । যে কথা-কটা মেয়েটা বলেছে, সেটা শুনতে খারাপ হলেও একেবারে ফেলে দেবার কথা নয়। কিন্তু শাশুড়িকে জ্ঞান দেওয়াটা মেনে নিতে পারেননি তিনি শাশুড়িমাতা। এসব কি তিনি জানেন না ? সংসার জীবনে একটা দুধের বাচ্চার কাছে এসব শোনার মতো ভীমরতী তার এখনও হয়নি ।
কিন্তু বিস্মরণ মানুষের জীবনে বেঁচে থাকার একটা অনন্য উপায় । মানুষ যদি অতীত-কে না ভুলতে পারতো, তবে তো রোমন্থন করতে করতে একদিন সে মরেই যেতো । পারস্পরিক দূরত্ব, দ্বেষ, ঈর্ষা, ইত্যাদি ভাব তাৎক্ষণিক বিস্মরণের প্রকৃষ্ট মাধ্যম হোল একটা পরিবারের মধ্যে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা বা কোনো উৎসব অনুষ্ঠান । সে সময় পরিবারের ছোটবড়, জ্ঞানী-অজ্ঞান সকলেই এমনভাবে যূথবদ্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে যে, মনে মনে তারা এই হিসেব ভুলে যায়, কে, কাকে, কবে, কীভাবে, কতটুকু অপমান করেছিলো বা অমর্যাদা করেছিলো । যুযুধান দুটি বা তার অধিক মানুষ আবার জীবনকে নতুন করে গড়ে নেয় । হয়তো তার অভিজ্ঞতা তাকে শিক্ষা দ্যায়, অথবা আবার একদিন তার চরিত্র বেরিয়ে আসে পুরনো আকৃতি নিয়ে । তখন উৎসব-আনন্দ নিক্ষিপ্ত হয় আদারে । এভাবেই পাপ, অসন্তোষ, অশান্তি-র সরীসৃপ বেড়ে উঠতে উঠতে একদিন একেবারে মাথায় এসে ছোবল মারে । তেমনটাই ঘটলো পুজোর ঠিক পরে । এ্যাতোটা ঘটলো যে, বাড়ি-র মেয়ে টুকটুকি রেগেমেগে তার জিনিসপত্র গুটিয়ে-বাটিয়ে নিজের বাচ্চাকে বগলদাবা করে চলে গেলো সোজা নিজের বাড়িতে । বাবা ডাকলেন পেছন থেকে । কিন্তু সে জানালো,
--- তোমরা তোমাদের বড়লোক বাড়ির বড়লোক পুত্রবধূ নিয়েই থাকো । এ বাড়িতে আমাদের সমাগমের দিন ফুরিয়েছে । আজকে ছোড়দা পর্যন্ত নেমে এলো বউ-এর হয়ে কলহ করতে ! এটা এ বাড়িতে কি কখনো ঘটেছে ? বউদি তো আজ চার চারটে বছর এসেছে…….। আমাদের চলে যাওয়াই ভালো ।
কেলেঙ্কারি হলো । জামাই ভাববে কী ! একটু চেঁচামেচি-তে পাড়ার কেউ কেউ শুনলও ঘটনাটা । শিউরে উঠলেন পরিতোষ বাবু । মাথা তাঁর হেট । এবারে বাড়ির বড়ো বৌ থেকে শুরু করে মহামায়া দেবী, এমনকি কাজের লোক পর্যন্ত…… সকলের মুখ থেকেই নানা ঘটনার পূর্ণ বিবরণ জঙ্গি বিস্ফোরণের মতো তাঁর কর্নকুহরে এসে পড়তে লাগলো একের পর এক । প্রত্যেকটাতে ছোট বৌ অভিযুক্তা । আর এর সবটা তার পতিদেবতাও জানে না ।
বাড়ির একমাত্র কন্যা অর্থাৎ কনিষ্ঠতমা টুকটুকি এসেছিলো বাবা-মায়ের কাছে। পুজোর পোশাক দেওয়া হলো একে অপরকে । মনেও রাখল না কেউ যে, এ বাড়ির ছোট বৌ একটু আপনি-কোপনি-র জীবনে বেশি আসক্ত । ননদ ভ্রাতৃবধু-র জন্যেও পছন্দ মতো শাড়ি আনলো । পছন্দ হলো, কি হলো না--- তা জানতে দিলো না সে । দাতা জানতে চাইলোও না । অন্তত কোনো কটু মন্তব্য গ্রহীতা করলো না। তাতে পুরনো কথা ভুলে গেলো বাড়ির মানুষ । পাঁচটা দিন কেটে গেলো নির্মলতায় । মেয়ে লৌকিকতা সেরে ফেরে গেছে নিজগৃহে। সে এলো ভাইফোটা-র দিন । ছোট বৌ যে তার বাপের বাপের বাড়িতে যাবে, তার কোনো দরকার নেই, কেননা তার কোনো ভাই-ই নেই। তারা মাত্র দুটিই বোন। হয়তো বড় বোন অন্য কোথাও কোন তুতো ভাই-টাই পাতিয়ে নিয়েছে । কিন্তু অঞ্জলি তা পারে না। পাতানো সম্পর্কে ওর রুচি নেই । তাই ওর মা ডাকে শিং জ্বালালে ।
আজকাল ননদের ছেলেকে নিয়ে কোন বিপত্তি বাধে না । সে জেনে গেছে, অন্য কোথাও চলে চলুক, এখানে তার ছোট মাইমা-র ঘরের কোনো জিনিসে হাত দেওয়া যাবে না । তাই শিশু হয়েও সে ছোটমামা-র ঘরটা এড়িয়ে চলে । আজকাল অঞ্জলি তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেও সে মাইমা-কে এড়িয়ে চলে। হয়তো গর্ভধারিণী তাকে এ বিষয়ে বিশেষ কোনো প্রশিক্ষণ দিয়েছিলো । বিগত মাস দুয়েক এ বাড়িতে সবাই চলছিলো সহজ ছন্দে, যথার্থ তালে আর প্রীতিকর নানা বানীতে । অর্থাৎ সুরে ও বানীতে তেমন কোনো সংঘর্ষ ঘটছিলো না । কিন্তু অকস্মাৎ অনর্থ ঘটে গেলো ।
ননদ তার বাবা, মা, নিজের ছেলে-র কিছু জামাকাপড় কাচতে নিয়েছে । সকাল থেকে নিজের গায়ে একটু ঘুষঘুষে জ্বর লক্ষ্য করেছে সে । তাই বাথরুমে জল ঘেঁটে কাচতে না বসে মনে মনে ঠিক করে নেয় যে, ছোট বউয়ের বাপের বাড়ি থেকে দেওয়া ওয়াশিং মেশিনটায় কাজটা সেরে নেবে । বাবা-মায়ের জামাকাপড় যে নিয়মিত কাচাকুচি হয় না, সেটা বাবার লুঙ্গি-গেঞ্জি, আর মায়ের সায়া-ব্লাউজ দেখলেই বোঝা যায় । মেয়ে বাড়িতে নিজে না থেকে বাবা-মাকে দেখতে পারে না বলে মন খারাপ করে । আর নিজের ছেলে বান্‌টি তো ছোট । ওদের তো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কোন মাথামুণ্ডু নেই । অঞ্জলি তখন বাথরুমে ছিল । বাবা-মা না জানলেও ননদিনী রায়বাগিনী জানে, কীভাবে এসব ব্যবহার করতে হয় । তার বাড়িতেও একটা মেশিন আছে । কিন্তু তা এত উঁচু মানের নয় । সাধারণ মানের । সেটা সামনে থেকে নয়, মাথা থেকে খুলে কাজ করতে হয় । সবে জামাকাপড় মেশিনে চাপিয়ে যথাযথ পদ্ধতিতে সে দিয়েছে চালিয়ে। সাথে সাথে বাথরুম থেকে প্রায় অর্‌দ্ধলঙ্গ অবস্থায় বেরিয়ে এসে চেঁচিয়ে উঠেছে অজলি,
--- কী করছো ! কী করছো, দিদি ! আমাকে অন্তত জিজ্ঞেস তো করবে ।
প্রথমটা বুঝতে না পেরে বোকার মতো তাকিয়ে থাকে সে । পরে বলে--- ওটা আমি পারি, ছোট বউদি। আমার বাড়িতেও মেশিন আছে । আমিই তো কাচি-টাচি।
ভ্রাতৃবধুকে জানাতে চায় ননদ যে, সে আকাট নয় । তাকে যেন আনাড়ি মনে করা না হয়। কিন্তু ভবি তো ভোলে না । সে-ও প্রতিবাদ করে,
--- সেটা তোমার মেশিন । তুমি চালাও । আর সেটা ম্যানুয়াল। এটা যে আমার মেশিন, দিদি । এটা তো তুমি চালাও না । এটা অটো টেকনোলজির মেশিন । কোথা থেকে কী করে দেবে, সর্বনাশ হবে । তুমি রাখ তো । আমি কেচে দেবো ।
--- হ্যাঁ, তুমি কাচবে ! তাহলে হলেই হ'য়েছে । তোমার কাচার বহর দেখেই তো আমাকে গুছিয়ে নিতে হ'য়েছে ।
--- ঠিক আছে । এবার থেকে না হয় তুমি এসে জামাকাপড় নিয়ে গিয়ে নিজের মেশিনে কেঁচে এনো । এবার তুমি সরো । সরো-ও-ও ।
এই শেষ সরো শব্দটা বেশ কঠিন আর আপত্তিকর ছিলো । সেটাই এমন আছ্‌ড়ে পড়তে ব্যস, অগ্নিতে ঘৃতাহুতি পড়ে বহুদিন বাদে । পুরনো রাগ জ্বলে ওঠে । অব্লিভিওন ইজ ম্যান--- দুদিন আগের সুখের দিনগুলো ভুলে যায় দুই মহিলা । আবার হয়ে যুযুধান । যেমন যুদ্ধ তারা শতাধিক বৎসর কাল ধরে দেখে আসছে, তেমনই কাপড় জড়িয়ে যায় কোমরে, কেশদাম দৃঢ়বিজরিত হয়ে ওঠে মাথা-র সুউচ্চে, কণ্ঠ ওঠে তার সপ্তকে, চোখ হয়ে ওঠে ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো, থাবা পড়তে থাকে পরস্পরের মুখে চোখে ।
চেঁচিয়ে ওঠে বাড়ির মেয়ে--- তুমি এ্যাতো ছোট মনের কেন, বৌদি ? আমাদের বাড়িতে তো এমনটা ছিলো না আগে । বড়ো বউদি-ও তো এ বাড়িতে এসেছে । কৈ ? সে তো তোমার মতো আমার আমার করে না !
মহিলা সকলের প্রশস্তি শুনতে প্রস্তুত, কিন্তু স্বজাতির প্রশস্তি ? তা-ও নিজেকে তুলনায় রেখে ? না না। তা কি হয় ! তাই অঞ্জলি ঝাল লঙ্কা ডলে দিলো । কার জিভে দিলো, কে জানে । যুদ্ধের আক্রমণে কি ব্যক্তি বিচার হয় ? সে তেড়ে বলল,
--- আমার মুখ খুলিও না, দিদি । দিদিভাই-এর সাথে আমাকে তুলনা করো না । সকলে শেষে তোমার কথাটা ভুলে যাবে । আমাকেই দুষবে ।
--- তোমার মুখ ? সে তো খোলাতে হয় না, ভাই । তোমার মুখ তো কলকাতা-র ম্যানহোল। খোলাই থাকে । দুর্গন্ধ তো বেরোচ্ছেই ।
--- তা তুমি সুগন্ধ তো নিজের বাড়িতে গিয়ে শুঁকলেই পারো । বিয়েওয়ালা ননদ এখানে দুমদাম করে এসে পড়ে থাকো কেন ? আর বাপের বাড়িতে খবরদারি করোইবা কেন ? আমাদের জামাকাপড় আমরাই কাচবোখন । তুমি নিজের চরকায় তেল দাও । ভাইফোঁটা তো আজ নয় । এ্যাতো সকাল সকাল আসো কেন ?
এসব মধুভাষ বাড়ির সকলে শুনতে পেলো । পরিতোষ বাবু, মহামায়া দেবী, বড়ো ছেলে প্রতীক, অঞ্জলির কর্তা বিপ্রদাস--- সকলেই একে একে জুটল বটে কিন্তু কেউই কিছু বলতে পারলো না উভয়ের অগ্নিমূর্তি দেখে । শেষে বিপ্র মুখটা খুলতেই মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো । বিপ্র জানে যে, তার স্ত্রী চেঁচানোর অপর নাম হলো অসুস্থ হয়ে পড়া । তাই বিপ্র সবে বলেছে,
--- জানিস তো টুকটুকি, অঞ্জুর হাই থাইরয়েড । মাথাটা ঠিক রাখতে পারে না । তোরাই বা কেন এমন একটা পরিস্থিতি বানাস !
--- বানাই মানে ! কী বলতে চাস তুই, ছোড়দা ? একটু খোলসা করতো ।
তাতে বিপ্র কিঞ্চিত অসম্মানিত হয় । আক্রমণ সে-ও শানায়--- তোর কাছে খোলসা করতে হবে কেন রে ? তুই তো বিবাহিতা । তুই আসবি, খাবি, ফুর্তি করবি, চলে যাবি । ব্যস। তুই এই পরিবারের হাঁড়ি আগলাতে যাস কেন ?
তাতেই বাড়ির মেয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, তোমরা তোমাদের বড়োলোক বাড়ির মেয়ে বড়লোক পুত্রবধূ নিয়েই থাকো । এ বাড়িতে আমাদের সমাগমের দিন ফুরিয়েছে । আজকে ছোড়দা পর্যন্ত নেমে এলো বউ-এর হয়ে কলহ করতে ! এটা এ বাড়িতে কি কখনো ঘটেছে ? বউদি তো আজ চার চারটে বছর এসেছে…….। আমাদের চলে যাওয়াই ভালো ।



পরিতোষ বাবু আর বিলম্ব করেননি । এবারে বিলম্ব করলে আর ভদ্রতা দেখালে তাঁর পরিবারে বড়ো রকমের ক্ষতি ঘটে যাবে । যৌতূক নামে এই নিষ্প্রাণ বস্তুগুলো এ বাড়ির প্রাণীগুলোকে শুধু নিষ্প্রাণ করেই দিচ্ছে না । গোটা পরিবারের যূথবদ্ধতা-কে কৌতুক পর্যন্ত করছে। না, আর বিলম্ব নয় । কিছুমাত্র কাল বিলম্ব নয় । যেখানকার জিনিস সেখানে ফিরিয়ে দিয়ে আসতে হবে । এটাই তাঁকে করতে হবে । ভদ্রস্থ কোনো একটা উত্তর দিয়ে দেওয়া যাবেখন । এখন বেলা দশটা । একটা টাটা চারশো সাত পাওয়া যাবে ঠিক । কাউকে দরকার নেই । একাই পারবেন তিনি । তাঁকে পারতে হবেই ।
গোটা বাড়িটা আর গোটা পাড়াটা-র মানুষ চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখল, দৃঢ় মনের মানুষটা কোনো বিঘ্ন ছাড়াই সব মালপত্র গুটিয়ে রওয়ানা দিলেন কুটুম বাড়ির উদ্দেশে । কারোর সাহস হলো না টুঁ শব্দটি করার ।

-------------------